বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭

রাতারাতি প্রকল্প বৃদ্ধি : অক্ষত বাঁধে বরাদ্দ ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা



দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ পুনঃনির্মাণ ও মেরামতকাজ শুরু করার কথা গত ১৫ ডিসেম্বর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে উপজেলার দেখার হাওর, সাংহাইর হাওর, কাচির ভাঙ্গা হাওর, খাই হাওর, জামখোলার হাওর ও কাউয়াজুরি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজে শুরুতে মোট ৪৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পিআইসি কমিটি গঠন করে। বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৬০টি প্রকল্পের মাধ্যমে পিআইসি দেওয়া হয়েছে। হাওরের অধিকাংশ পিআইসি কমিটির লোকজন বাঁধের কাজ করলেও এখনো অনেক পিআইসি তাদের কাজ শুরু করতে পারেননি। চলতি বছরে উপজেলার কাউয়াজুরি হাওরে মোট ৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পিআইসি গঠন করা হয়। কাজের মেয়াদের ১ মাস ১০ দিন পর পানি উন্নয়ন বোর্ড রাতারাতি কাউয়াজুরি হাওরের ৫টি প্রকল্প ভেঙে মোট ১৫টি প্রকল্প গ্রহণ করে। আগের ৫টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা ছিল ৮৪ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা। এখন কাজের পরিমাণ না বাড়িয়ে ১৫টি প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা দেয়া হয়েছে। পিআইসিদের কার্যাদেশ প্রদানসহ পিআইসি কমিটি গঠন কিংবা তাদেরকে বাঁধের কোন কাজ এখন পর্যন্ত বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এমনকি ১০টি পিআইসি কমিটি গঠন করা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের কাউয়াজুরি হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট লোকজন সার্ভে জরিপ, প্রাক্কলন তৈরি করে এবং কাজের শুরুতে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মোট ৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের জন্য পিআইসি কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের কাজও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলম কোন এক অদৃশ্য কারণে কাউয়াজুরি হাওরের ৫টি প্রকল্পের কাজ পিআইসি কমিটির লোকজনদেরকে কার্যাদেশ বুঝিয়ে না দিয়ে সময় ক্ষেপণ করেন।
হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শুরুর ১ মাস ১১ দিন পর (৯ ফেব্রুয়রী) কাউয়াজুরির হাওরের ৫টি প্রকল্প ভেঙে কাজের পরিমাণ না বাড়িয়ে ১৫টি প্রকল্প তৈরি করে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সরেজমিনে কাউয়াজুরি হাওরে ঘুরে দেখা যায়, কাউয়াজুরি হাওরের ২২ কিলোমিটারের মধ্যে ১১ কিলো ৩০০ মিটার বেড়ি বাঁধের মধ্যে পুরো বাঁধের অধিকাংশ বাঁধ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ৫টি পিআইসির মধ্যে দুইটিতে ১ শত ৫০ মিটারের মতো মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। অন্য কোন পিআইসিকে কাজ করতে দেখা যায়নি। কাওয়াজুরি হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজের শুরুতে ৫টি পিআইসি গঠন করে। পিআইসি লোকজনদের দাবিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারি প্রকৌশলী মাহবুব আলম দু-একটি পিআইসি’র কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। নতুন পিআইসিদের কার্যাদেশ প্রদানসহ পিআইসি কমিটি গঠন কিংবা তাদেরকে বাঁধের কোনো কাজ বুঝিয়ে দেয় হয়নি। কাউয়াজুরী হাওরের বিগত ২০১৭-১৮ অর্থ বছর কোন কাজ হয়নি। স্থানীয় কৃষকদের দাবিতে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দুইটি ভাঙা বন্ধকরণের কাজ হয়। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে কাউয়াজুরি হাওরে নতুন করে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হলে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫৮ লক্ষ ৩১ হাজার ২০৪ টাকা। চলতি বছর ২০২০-২১ অর্থ বছরে পুরাতন বাঁধের উপর সংস্কারকাজের মৌখলা গ্রামের পূর্ব পাশ হতে বীরগাঁও প্রামের পশ্চিম পর্যন্ত অক্ষত বাঁধ রয়েছে। কৃষকদের মতে কাউয়াজুরি হাওরের সাড়ে ৭ কিলোমিটার বাঁধকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাগজে-কলমে ১১ কিলো ৩০০ মিটার কাজ দেখিয়ে পুরাতন বাঁধের উপর তিনগুণ প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এযেন সরকারি টাকায় শুভঙ্করের ফাঁকি। যা পিআইসিদের মাধ্যমে কাজের প্রগ্রেস বাড়িয়ে দেখানোর নামে সরকারি টাকা আত্মসাতের মহোৎসবে নামেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, কাউয়াজুরি হাওরে চলতি বছর মোট আবাদী জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ৭৫ হেক্টর এবং হাইব্রিড ও উফসি জাতীয় বোরোধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৫ শত মেট্রিক টন ধান।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক কৃষি কর্মকর্তা জানান, হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে যে টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। যদি কৃষি বিভাগের কোন কর্মকর্তাদের এ কাজে সম্পৃক্ত করা হতো তাহলে কোনো হাওরে কত হেক্টর ফসলি জমি আছে এবং কতটুকু আবাদ করা হয়েছে। তা নিরূপণ করে সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। মাঠে কাজ করে কৃষি বিভাগের লোকজন, কোন জায়গায় বাঁধ প্রয়োজন আর কোন জায়গায় বাঁধের কোন প্রয়োজন নাই তা সঠিক ভাবে তুলে ধরা যেত। হাওরে অপ্রয়োজনীয় বাঁধের ছড়াছড়ি হতো না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন একত্রে কাজ করলে সরকারি টাকার অপচয় কিছুটা রোধ হতো।
কাউয়াজুরি হাওর এলাকা ঘুরে আরও জানাযায়, উপজেলার কাউয়াজুরী হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের শেষদিকে এসে নামমাত্র পিআইসি গঠন করে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন পিআইসিদের কাছ থেকে ঠিকাদারি প্রথার মাধ্যমে কাজ বুঝে নেয় এবং যে যার মতো করে বৈশাখের শেষে বন্যার পানি আসার আগমুহূর্তে পর্যন্ত কাউয়াজুরি হাওরের বাঁধের চলমান থাকে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। কাউয়াজুরি হাওরটি দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এবং পায়ে হাঁটা ছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই। যার ফলে সরকারি কোন কর্মকর্তা, তদারকি কর্মকর্তা হওরে যাওয়াই দুষ্কর। তাই সময়মতো কাজ সম্পন্ন হয় না এবং নামমাত্র পিআইসি গঠন করে পুরো টাকা যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের পকেটে।
মৌখলা গ্রামের কৃষক অমৃত দেবনাথ, অমুল্য দাস ও শচীন্দ্র দাস জানান, এবছর বাঁধের কাজ এখনো শুরু হয় নাই। দুইটি পিআইসি সামান্য মাটি ফেলে রেখেছে। এখন আর মাটি ফেলছেনা। এস্কেভেটর নষ্ট বলে বন্ধ করে রেখেছে। এ বাঁধের প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার বাঁধ এখনও অরক্ষিত। বাঁধের কাজ কবে শুরু হবে এবং কবে শেষ হবে তা ভগবান জানেন।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলম জানান, কাউয়াজুরি হাওরের ৫টি প্রকল্প ভেঙে এখানে ১৫টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কাউয়াজুরি হাওরের প্রকল্পটি মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্প। তাই বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলা কমিটি অনুমোদন দিলেই আমরা কাজ শুরু করবো। তিনি জানান, কাজের মেয়াদের মধ্যে পিআইসি কমিটি কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে ঠিকাদারকে দিয়ে বাস্তবায়ন করবো।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, যে ৫টি প্রকল্প ছিল এই ৫টিকেই ১৫টি প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। এখানে কোন ক্লোজার বা বড় ভাঙ্গা নেই। বাঁধে শুধু টানা কাজ, কাজের নকশা পরিবর্তন করে আগের উচ্চতা থেকে এখন একটু বেশি দেওয়া হয়েছে। তাই বরাদ্দে বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে পিআইসিরা এই কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।