রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১ | ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

শ্রমিক সংকট মেটাচ্ছে কম্বাইন হারভেস্টার : কৃষি যান্ত্রিকী করণে কমছে উৎপাদন খরচ



সুনামগঞ্জের একমাত্র বোর ফসল চাষাবাদ থেকে ধান কর্তন, মাড়াই ও ঘোলায় ঊঠানো পর্যন্ত কৃষকদের শ্রমিক সংকট নিত্যদিনের। আগাম কৃষকদের ব্যাপারীকে বায়নার টাকা দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক মেলানো খুবই দুষ্কর। পাশপাশি হাওরে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে সময় লাগে বেশি, আবার এক সাথে ধান কাটা শুরু হলে সুনামগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলায় পাওয়া যায়না পর্যাপ্ত পরিমানে শ্রমিক। এতে করে অকাল বন্যায় এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থাকে শতভাগ। তবে দ্রæত সোনালী ফসল ঘরে তুলতে এবং শ্রমিক সংকট মেটাচ্ছে সরকারের ভূর্তুকি মুল্যে বিতরণ করা ধান কাটা মেশিন কম্বাইন হারভেস্টার। কৃষকেরা কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে একই সঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের কাজ করছেন। কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটায় কমছে কৃষকদের উৎপাদন খরচ। অল্প সময়ে অধিক জমির ধান কর্তন করতে পেরে খুশি স্থানীয় কৃষকেরা। এতে করে শ্রমিক সংকট মেটার পাশাপাশি বোরো ধান উৎপাদনে খরচ কমবে বলে জানিয়েয়েছন স্থানীয় হাওর পাড়েরর একাধিক কৃষক।
দ.সুনামগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, উপজেলায় মোট কৃষি জমির পরিমান ২২ হাজার ২ শত হেক্টর। চলতি বছর ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ফসলের আবাদ করা হয়েছে। এতে কৃষি বিভাগ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন চাউল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এবার উপজেলায় হাইব্রিড জাতের ১ হাজার ৮ শত ৬০ হেক্টর, উফশী, ব্রি ২৮, ২৯ জাতের ধান ১ হাজার ৯ শত ৮৭ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ৬শত ১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় শ্রমিক সংকট নিরসনে উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের মাঝে উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সরকারি ভূর্তকি মুল্যে ১০টি ও বিগত বছরে আরো ০৮টি হারভেস্টার(ধান কাটার মেশিন) স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। বছরের একটি ফসল বোরো ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিক সংকটের কারণে হিমশিম খেতে হয় স্থানীয় কৃষকদের। জেলা জুড়ে একসাথে ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। আর চাহিদার পাশাপাশি বেড়ে যায় শ্রমিকের পারিশ্রমিক। এতে করে বোরো ধান উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয় কৃষকদের। কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনে খুব সহজেই ধান কর্তন করে ঘরে তুলতে পারছে এখানকার কৃষকরা। কৃষি বিভাগ বলছে, আগে যেখানে এক কেদার জমির ধান কর্তন করতে ধান কাটার শ্রমিকদের দিতে হতো ৩ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা আর এখন একটি হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ঘন্টায় তিন থেকে চার বিঘা জমির ধান অনায়াসেই কর্তন করা যাচ্ছে। এতে করে ৮ থেকে ১০লিটার ডিজেল তেল খরচ হয়। আর প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্যে মাত্র ৬৫ টাকা। এতে করে ৮ থেকে ১০লিটার ডিজেলের মূল্যে আসছে মাত্র ৬৫০ টাকা। কিন্তু এই তিন থেকে চার বিঘা জমির ধান শ্রমিক দিয়ে কাটতে গেলে বিঘাপ্রতি কৃষককে খরচ করতে হতো তিন থেকে চার হাজার টাকা। দূরত্ব ভেদে খরচ বেড়ে যায় আরও বেশি। এতে করে খরচও বেড়ে যায় ধান উৎপাদনে।
নাগডোরা হাওরের সদরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হক জানান, সরকারের মাধ্যমে ভুর্তকি মুল্যে এবার একটি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ক্রয় করেছি। এবছরের বৈশাখ মাসের ১০/১২ দিনের মধ্যে আমার সকল জমির ধান কর্তন করেছি এবং ধান সাথে সাথে খলায় শুকিয়ে ঘোলাও তোলে ফেলেছি। পাশপাশি একটু বাড়তি লাভের আশায় অন্যান্য কৃষকদের জমির ধান আমার মেশিন দিয়ে কর্তন করে অর্থ উপার্জন করছি। তবে সরকারের এ উদ্যোগের ফলে সুনামগঞ্জের কৃষকদের ফসল আবাদের খরচ অনেকাংশে কমে যাবে। শ্রমিক সংকঠে আমাদের দুঃচিন্তায় পড়তে হবে না।
দেখার হাওরের আস্তমা গ্রামের কৃষক আব্দুল অদুদ জানান, প্রতি বছর বোর ধান কর্তন করার সময় শ্রমিক সংকঠে ভোগতে হতো। শ্রমিকদের বৈশাখের ২/৩ মাস আগ থেকে টাকা দিয়ে বায়না করে ব্যাপারীকে রাখতে হতো। এখন এই সমস্যাটা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরকার কৃষি কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি আনার ফলে আমাদের জমি চাষাবাদ থেকে শুরু করে ধানের ঘোলায় উঠানো পর্যন্ত খরচ অনেকাংশ কমে যাবে।
উপজেলা উপ সহকারি কৃষি অফিসার আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ উপজেলায় প্রতি বছরই বোরো ধান কাটতে শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারন করে। কৃষকরা শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মত ধান ঘরে তুলতে পারতেন না। যার যার কারণে অকাল বন্যায় কৃষকদের ধানের ক্ষয় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে। তবে গত দুই বছর ধরে সরকারের কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে খুব দ্রæত কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারছে। একটি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন এক ঘন্টায় ৩বিঘা জমির ধান কাটতে পারে। অথচ শ্রমিক দিয়ে কাটলে ৪ থেকে ৬জন শ্রমিক সারাদিন এক বিঘা জমির ধান কাটতে পারে। এতে করে প্রচুর সময়ে লেগে যায়। খরচও বাড়ে কৃষকদের। এজন্য কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে প্রতিটি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের দাম যেখানে ২৯ থেকে ৩০লাখ টাকা, সেখানে সরকার প্রতিটি মেশিনের ওপর ১৪লাখ টাকা করে ভুর্তকি দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই মেশিনের আমদানী খরচ কমানো সম্ভব হলে প্রান্তিক চাষী পর্যায়ে পৌছানো সম্ভব।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার সজিব আল মারুফ জানান, চলতি বছর বোর ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থেকে উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ কৃষিক আগাম জাতের ব্রি ২৮, ২৯, ও হাইব্রিড এল সি-৮ জাতের ধান চাষাবাদ করেছেন। আজ সোমাবার (২৬ এপ্রিল) পর্যন্ত স্থানীয় কৃষকেরা ৮৫ ভাগ এবং হাওরের বাহিরে ৩০ ভাগ ধান কেটে ফেলেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সব ধান কেটে ঘরে তুলতে পারবে কৃষকেরা। করোনা কালীন সময়ে অনেক কৃষক শ্রমিক সংকঠে হতাশ ছিলেন। সরকার এ উপজেলায় চলতি বছর ১০টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন(ধান কাটার) যন্ত্র কৃষকদের মাঝে ভূর্তুকি মূল্যে বিতরণ করেছেন। আশাকরি আগামী দিনে কৃষকদের ফসল আবাদে উৎপাদন খরচ কমে আসবে। ধান দ্রæত সময়ের মধ্যে ঘরে তুলতে পারবে।